একজন রোহিঙ্গাও যেতে রাজি না

বাংলাদেশ পুরোপুরি প্রস্তুত। রোহিঙ্গাদের প্রথম দল নিজেদের দেশ মিয়ানমারে ফিরে যাবে। কক্সবাজারে আশ্রয়শিবির থেকে সীমান্ত পর্যন্ত তাদের নিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় পাঁচটি বাস ও তিনটি ট্রাক দাঁড়িয়ে। ফিরে যাওয়া উৎসাহিত করতে রোহিঙ্গা শিবিরে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে চীন ও মিয়ানমার দূতাবাসের কর্মকর্তারাও। কিন্তু যে রোহিঙ্গাদের যাওয়ার কথা তাদের কেউই ফিরতে রাজি হয়নি। এ কারণে গতকাল বৃহস্পতিবার দিনভর অপেক্ষার পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর আরেকটি উদ্যোগও ভেস্তে গেল। এর আগে গত বছরের ১৫ নভেম্বরও প্রত্যাবাসন শুরুর উদ্যোগ ব্যর্থ হয়।

মানবাধিকারের প্রতি অঙ্গীকার থেকে বাংলাদেশ আগেই বলেছে, কোনো রোহিঙ্গাকেই জোর করে ফেরত পাঠানো হবে না। তবে কেউ স্বেচ্ছায় ফিরতে চাইলে তাদের প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনও দুই দিন আগে বলেছিলেন, রোহিঙ্গাদের অনেকেই মিয়ানমারে ফিরতে চায়। গতকাল প্রত্যাবাসন শুরুর উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়াকে দুঃখজনক অভিহিত করে তিনি বলেন, আস্থার ঘাটতির কারণে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরতে চাচ্ছে না। রোহিঙ্গা সংকট মিয়ানমারের সৃষ্টি, আর এ সংকট মিয়ানমারকেই সমাধান করতে হবে। এ ছাড়া ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মানবিক সহায়তা কমার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা যাতে ফিরে যায় সে জন্য তাদের ‘আরাম’ কমানো হবে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনবিরোধী হয়ে উঠতে উসকানিদাতাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

এদিকে প্রত্যাবাসন নিয়ে আরো দুঃসংবাদ মিলেছে গতকাল সন্ধ্যায় জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) বিবৃতিতে। প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার ছাড়পত্র দিয়েছে এমন রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছে সংস্থাটি। ওই তালিকায় থাকা রোহিঙ্গাদের মধ্যে একজনও বর্তমান পরিস্থিতিতে মিয়ানমারে ফিরতে রাজি হয়নি। তবে তাদের অনেকে বলেছে, মিয়ানমারে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও চলাফেরার স্বাধীনতা নিশ্চিত হলে তারা ফিরতে পারে।

ইউএনএইচসিআর জোর দিয়ে বলেছে, রোহিঙ্গাদের ফেরার জন্য আস্থা সৃষ্টি অপরিহার্য। গত জুলাই মাসের শেষ দিকে মিয়ানমারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এ দেশে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেছেন। সে সময় দুই পক্ষের (মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা) মধ্যে যে আলোচনা হয়েছিল তা আগামী দিনেও অব্যাহত রাখা উচিত। রোহিঙ্গাদের নিজ বসতভূমিতে ফিরে যাওয়ার জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে ইউএনএইচসিআর ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে মিলে রাখাইন রাজ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। তবে এর জন্য রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বসতভূমি ও ফেরার সম্ভাব্য স্থানগুলোতে প্রবেশাধিকার চায় ইউএনএইচসিআর ও ইউএনডিপি।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখেরও বেশি। মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী ২০১৬ সালের অক্টোবর মাস থেকে এ যাবৎ আসা রোহিঙ্গাদেরই প্রথমে প্রত্যাবাসন এবং সেটি সম্পন্ন হওয়ার পর তার আগে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য বিবেচনা করা হবে। তারই আলোকে বাংলাদেশ এ যাবৎ ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসের পর থেকে আসা প্রায় ৫৫ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা মিয়ানমারকে দিয়েছে। তাদের মধ্যে মাত্র তিন হাজার ৪৫০ জনকে ফেরত নেওয়ার জন্য তালিকা পাঠিয়েছে মিয়ানমার। এর মধ্যে ১৫টি পরিবারের ৪৭ জনের নাম দুইবার করে আছে। সংশোধিত তালিকা অনুযায়ী এক হাজার ৩৮টি পরিবারের তিন হাজার ৩৯৯ জন রোহিঙ্গার সম্মতি যাচাইয়ের জন্য গত ৮ আগস্ট বাংলাদেশ জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থাকে দায়িত্ব দিয়েছিল। সেই তালিকা অনুযায়ী, রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়ার আগ্রহ যাচাই করার প্রক্রিয়া শুরু হয় গত মঙ্গলবার।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, মিয়ানমার ২২ আগস্ট থেকে তিন হাজার ৪৫০ জন রোহিঙ্গাকে গ্রহণ করার কথা বলেছে। অর্থাৎ ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার তারিখ ছিল। বাংলাদেশের সঙ্গে সমঝোতা অনুযায়ী, মিয়ানমার দুটি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ১৫০ জন করে দিনে সর্বোচ্চ ৩০০ জন রোহিঙ্গা গ্রহণ করবে। অর্থাৎ ওই তালিকার সবাই ফিরতে রাজি হলেও ১১ দিনেরও বেশি সময় লাগবে প্রত্যাবাসনে।

তাঁরা আরো বলেছেন, মিয়ানমার প্রত্যেক রোহিঙ্গার পরিচয় যাচাই করে ফেরত নেবে। রোহিঙ্গারা যদি ভবিষ্যতে ফিরতেও চায় তবে তাদের প্রত্যাবাসন সম্পন্ন করতে কত বছর লাগতে পারে তা অনুমান করা কঠিন। আর রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের বোঝা বাংলাদেশের ওপর চাপবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, এত দিন বলা হচ্ছিল যে চীন ভূমিকা রাখলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সহজ হবে। চীন সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় মিয়ানমার প্রত্যাবাসনে রাজি হয়েছে এবং চীন দূতাবাসের দুজন কর্মকর্তাও গতকাল কক্সবাজারে উপস্থিত ছিলেন। ভারতও প্রত্যাবাসন উদ্যোগে সমর্থন দিয়েছে।

তিনি বলেন, চীনের সম্পৃক্ততা সত্ত্বেও রোহিঙ্গারা ফিরতে রাজি না হওয়া এই সংকটের জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা আরো বাড়ার ইঙ্গিত বহন করে। প্রথমত, মিয়ানমার গত দুই বছরে রোহিঙ্গাদের ফেরার মতো অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি। নাগরিকত্বের বিষয় তুললে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে রাজি হবে না—চীনের এ কথার পর বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে গিয়ে ‘ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড (এনভিসি)’ নিতে উৎসাহিত করছে। অন্যদিকে রোহিঙ্গারা তাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্বকে ফিরে যাওয়ার প্রধান শর্ত হিসেবে তুলে ধরছে।

নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনা আজ : এদিকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আজ শুক্রবার নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। গত বুধবার রাতে যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশের অনুরোধে প্রত্যাবাসন নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়। আলোচনার পর জাতিসংঘে যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক সমন্বয়ক স্টিফেন হিকি বলেন, ‘মিয়ানমারে জটিল সময় চলছে। আগামী দিনগুলোতে আমরা বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন চুক্তি বাস্তবায়ন দেখার আশায় আছি। আমরা মনে করি, প্রত্যাবাসন স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও সম্মানজনক হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সন্তুষ্ট যে ইউএনএইচসিআর মাঠে আছে। তারা বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দুই দেশের সঙ্গেই কথা বলছে।’

তিনি বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে ওই তিনটি নীতি অনুসরণ করা নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা পরিষদের কাজ করা উচিত। আমার মনে হয়, এটি নিশ্চিত করার জন্য নিরাপত্তা পরিষদের জোরালো সমর্থন আছে।’

অন্যদিকে রাশিয়ার উপস্থায়ী প্রতিনিধি দিমিত্র পলিয়ানস্কি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘যেকোনো দীর্ঘ যাত্রার শুরু হয় প্রথম ধাপ থেকে। প্রথম ধাপটি শুরু করা প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, ‘ফেরার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব তাদের (রোহিঙ্গাদের)। যদি তারা ফিরতে চায় তবে তাদের ফিরতেই উৎসাহিত করা উচিত। তাদের নিরুৎসাহ করার দরকার নেই।’

রোহিঙ্গাদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়া গ্রুপের উল্লাস

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here