শনিবার, ১৮ই জানুয়ারি, ২০২০ ইং, ৫ই মাঘ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
আজ শনিবার | ১৮ই জানুয়ারি, ২০২০ ইং

ডেঙ্গুর প্রকপে ঈদ আনন্দ ম্লান

শুক্রবার, ০২ অগাস্ট ২০১৯ | ৯:২৬ এএম | 69 বার

ডেঙ্গুর প্রকপে ঈদ আনন্দ ম্লান

দুয়ারে কড়া নাড়ছে ঈদুল আজহা। এ সময় পেশাজীবী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী কিংবা শিল্পপতি- সবারই কোরবানির পশু কেনাসহ আনুষঙ্গিক কাজের প্রস্তুতি নেয়ার কথা। তবে সারাদেশে ডেঙ্গুর দাপটে সে চিত্র এখন পুরোপুরি উধাও। বরং ডেঙ্গু আতঙ্কে শহর-বন্দর-গ্রামে সবাই তটস্থ। আবার কেউ কেউ ডেঙ্গু আক্রান্ত স্বজনদের নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন এ হাসপাতাল থেকে ও হাসপাতালে; রোগীর শয্যা পাশে তাদের দিন-রাত একাকার। তাই ঈদ আনন্দ নেই কারও ঘরেই।

এদিকে সারাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করে নিজ নিজ কর্মস্থলে থাকার নির্দেশনা এবং অন্যান্য বিভাগের কর্মীদের এবার ঈদুল আজহার ছুটি নেয়ার ব্যাপারে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করায় নাড়ির বাঁধন ছিড়ে বিভিন্ন জেলা শহরে কর্মরত সরকারি চাকুরেদের ঈদ আনন্দ অনেকটাই মাটি হতে চলেছে। অন্যদিকে যেসব স্বজন তাদের ঢাকায় চাকরিরত বাবা-মা-ভাই-বোন কিংবা স্ত্রী-সন্তানের গ্রামে ফেরার প্রতীক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে সময় গুনছিলেন, তাদের অনেকের চোখে এখন কান্নার জল। দুঃখ-কষ্ট-হতাশায় এরই মধ্যে অনেকেই ঈদ আনন্দ উদযাপনের প্রস্তুতি থেকে নিজেদের পুরোপুরি গুটিয়ে নিয়েছেন। যদিও সামর্থ্যবানরা পশু কোরবানি দেয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রাখছেন।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা শহর ও গ্রামাঞ্চলের তৈরি পোশাক বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বছর ঈদের দু-তিন সপ্তাহ আগে থেকে বেচাবিক্রির ধুম পড়লেও এবার তা নেই বললেই চলে। শহরকেন্দ্রিক দোকানগুলোতে স্বল্পসংখ্যক ক্রেতার আনাগোনা থাকলেও তারাও তেমন কিছু কিনছেন না।

এদিকে জেলা শহর ও গ্রামাঞ্চলের দোকানিরা জানান, কোরবানির ঈদে জামা-কাপড়ের জমজমাট বেচাকেনা না থাকলেও ঈদের আগে প্রায় সব মার্কেটেই উৎসুক ক্রেতার ভিড় লেগেই থাকত। তরুণ-তরুণীরা শখের বশে এ মার্কেট থেকে ও মার্কেটে ঘুরে বেড়াত। তবে সারাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ায় এ স্রোতেও ভাটার টান ধরেছে।

অন্যদিকে গ্রামাঞ্চল ও মফস্বল শহরের খামারিরা জানান, কোরবানির ঈদের ২০-২৫ দিন আগে থেকেই ব্যাপারিরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে গৃহস্থের গরু কেনেন। এর পর তারা খামারিদের গরু কেনার জন্য দরাদরি শুরু করেন। গৃহস্থদের কাছ থেকে গরু সংগ্রহের সংখ্যা কিছুটা বেশি হলে খামারিদের গরুর দর কম দিতে চান। কিন্তু এবারের চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। বন্যা, গো-খাদ্য সংকট এবং এর দাম চড়া হওয়ায় বিপদগ্রস্ত অনেক গৃহস্থ তাদের পালা গরু-ছাগল-মহিষ কম দামে

বেচে দিতে চাইলেও ব্যাপারিরা তা কিনতে ততটা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। খামারের গরু কেনাতেও তারা এখনো অনেকটা পিছিয়ে রয়েছেন।

এর কারণ ব্যাখ্যা দিয়ে রাজধানীর গাবতলীর গরুর হাটের ব্যাপারি আক্কাছ মুন্সি বলেন, ‘সারাদেশের মানুষ ডেঙ্গুর আতঙ্কে সিটিয়ে আছে। আর যারা এরই মধ্যে ডেঙ্গুজ্বরে পড়েছে, তাদের স্বজনরা কোরবানির পশু কেনার কথা ভুলে রোগী নিয়ে ছোটাছুটি করছেন। এ অবস্থা চলতে থাকলে ঈদের আগে কোরবানির পশু বেচাকেনা কতটা জমবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তাই ব্যাপারিরা ঝুঁকি নিয়ে গবাদি পশু মজুদ করতে চাইছে না।’ শেষ সময়ে বাজার দেখে তারা গরু কিনবে বলে মনে করেন আক্কাছ ব্যাপারি।

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গত ২৯ জুলাই থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিমা কর্মকর্তা ওলিউল ইসলাম জানান, ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে যাবেন এ আশায় ছোট ভাই-বোনসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য বেশকিছু পোশাক-পরিচ্ছদ কিনেছেন। কোরবানির গরু কেনার জন্য গ্রামে টাকাও পাঠিয়েছিলেন। তবে আকস্মিকভাবে তিনি ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হওয়ায় তার গোটা পরিকল্পনাই ভেস্তে গেছে। তার সেবা-শুশ্রূষার জন্য গ্রাম থেকে বাবা-মা ঢাকায় ছুটে এসেছেন। ঈদের আগে তারাও গ্রামে ফিরতে পারবেন কী না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এ অবস্থায় তার গোটা পরিবারের ঈদের আনন্দ পুরোপুরি উবে গেছে বলে জানান ওলিউল।

একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বাবার শয্যাপাশে থাকা কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী ইয়াদ আলী জানান, কদিন আগে গ্রাম থেকে বৃদ্ধ বাবা-মা ঢাকায় এসেছিলেন হার্টের চিকিৎসা করানোর জন্য। তবে ২৭ জুলাই আকস্মিক তার বাবা ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হন। ২৮ জুলাই থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এ কদিনে তার শারীরিক অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। বরং দিন দিন তা খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ অবস্থায় তাকে নিয়ে পরিবারের সবাই চরম উৎকণ্ঠায় দিন পার করছেন।

ইয়াদ আলী বলেন, ‘বাবা শিগগিরই সুস্থ না হলে আমাদের সবার ঈদ আনন্দ মাটি হয়ে যাবে। ঈদের আগে বাড়ি যেতে পারব কিনা তা নিয়েও সন্দেহ আছে। ঈদের আনন্দ হোক না হোক বাবা যাতে সুস্থ হয়ে ওঠেন, রাতদিন আলস্নাহর কাছে এ কামনা করছি।’

মাতুয়াইল মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের গাড়িচালক আমিনুল ইসলাম জানান, বাবা-মা, ভাই-বোন ও স্ত্রী-সন্তানসহ সবাই ঈদের ছুটিতে তার গ্রামে ফেরার অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছেন। অথচ তিনি গত চার দিন ধরে হাসপাতালের বিছানায় শয্যাশায়ী। পাছে আত্মীয়-স্বজনদের ঈদ আনন্দ নষ্ট হয়ে যায় এ আশঙ্কায় প্রথমে তিনি বাড়িতে তার ডেঙ্গু হওয়ার সংবাদ দিতে চাননি। তবে ঢাকায় তার দেখাশোনার কেউ না থাকায় পরে তাদের তা জানাতে বাধ্য হয়েছেন।

আমিনুল জানান, গ্রাম থেকে তার দুই ভাই ঢাকায় এলেও পুরো পরিবার চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। ঈদের আগে সুস্থ হয়ে গ্রামে ফিরতে না পারলে তাদের সবার আনন্দই বিষাদে পরিণত হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে ঢাকায় কর্মরতদের ঘরে ফেরার প্রতীক্ষায় স্বজনরা প্রহর গুণলেও এ নিয়ে বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তাদের ভাষ্য, স্বজনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে রাজধানী থেকে যাওয়া প্রায় এক কোটি মানুষ সারাদেশের ঈদ আনন্দ আরও ভয়াবহভাবে পন্ড করে দিতে পারে। কেননা গ্রামমুখী এই মানুষদের অনেকেই নিজের অজান্তেই শরীরে ডেঙ্গুর জীবাণু বহন করছে। তারা গ্রামে যাওয়ার পর তা জেলা ও মফস্বল শহর ছাড়িয়ে গ্রামাঞ্চলেও বিস্তার ঘটাতে পারে।

তাই শহরে থাকতেই কারও জ্বর হলে বা বিশেষ প্রয়োজন না থাকলে ঈদে গ্রামে না যাওয়াই সমীচীন হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এ বিষয়টি আদৌ যে কেউ মানতে রাজি নন, তা বাস-লঞ্চ ও ট্রেনের টিকিট বিক্রির ভিড় দেখে নিশ্চিত হওয়া গেছে। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, বিগত কোরবানির ঈদগুলোতে যে সংখ্যক মানুষ বিভিন্ন গন্তব্যে ঢাকা ছেড়েছেন, এবার তাদের সংখ্যা কোনো অবস্থাতেই কম নয়। বরং রেলপথে টিকিট বিক্রির ভিড় আগের চেয়ে বেড়েছে।

আর এ বিষয়টিকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন। তাদের ভাষ্য, বর্তমানে রাজধানীর হাজার হাজার মানুষ ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত। হাসপাতালে ভর্তি হননি এমন রোগীরও কোনো পরিসংখ্যান নেই। আবার মশার কামড়ে শরীরে ভাইরাস প্রবেশ করেছে, এখনো জ্বর হয়নি এমন মানুষের সংখ্যাও অনেক। ফলে ঈদ উপলক্ষে রাজধানী ছেড়ে এসব মানুষ গ্রামে গেলে সেখানেও ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই এ বিষয়টি নিয়ে তারা গভীর উদ্বেগে রয়েছেন।

যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদের দাবি, এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বিভিন্ন জেলায় ডেঙ্গুর চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যাতে শহর থেকে আসা মানুষের মাধ্যমে এর বিস্তার ঘটলে পরিস্থিতি দ্রম্নত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। সেখানকার চিকিৎসকদেরও এ ব্যাপারে আগাম নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এ ধরনের তৎপরতার কথা তারা নানা মাধ্যমে শুনেছেন। তবে গ্রামাঞ্চলে কেউ ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে তাকে চিকিৎসার জন্য জেলা শহরে ছুটতে হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রেও ডেঙ্গুজ্বরের চিকিৎসার পর্যাপ্ত সুযোগ নেই বলে দাবি করেন তারা।


সর্বশেষ  
জনপ্রিয়  
ফেইসবুক পাতা